চেয়ারে বসে নামায কি জায়েয ?

485

দাঁড়িয়ে নামায আদায় করা নামাযের একটি ফরজ রোকন। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্য বিনীতভাবে দাঁড়াবে। (সূরা বাকারাহ: আয়াত- ২৩৮)। হযরত জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, রাসুল (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কোন ধরনের সালাত উত্তম? তিনি বললেন, দীর্ঘ কিয়াম করা, (তিরমিযী)। অন্য এক হাদিসে আছে, হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুল (সাঃ) এতো দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে নফল নামায পড়তেন যে, তাঁর পদদ্বয় ফুলে যেত। তাঁকে বলা হতো, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি এতো কষ্ট করেছেন, অথচ আল্লাহ তায়ালা আপনার পূর্বাপর সমস্ত গুনাহ্ ক্ষমা করে দিয়েছেন। তিনি বলতেন, আমি কি একজন কৃতজ্ঞ বান্দা হবোনা (শামায়েলে তিরমিযী)। কিন্তু বর্তমানে প্রায় মসজিদেই অনেক মুসল্লীকে চেয়ারে বসে নামায আদায় করতে দেখা যায়। শরীয় বিধানে চেয়ারে বসে নামায আদায় করা যাবে কিনা তা জানা খুবই জরুরী। চেয়ারে বসে নামায আদায় করা যাবে কি না এ সংক্রান্ত কিছু ব্যাখ্যা নিম্নে তুলে ধরা হল ঃ
১। দাঁড়াতে সক্ষম হলে ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নাতে মুয়াক্কাদা নামায দাঁড়িয়েই আদায় করতে হবে। এ সকল নামায বসে আদায় করলে, সহীহ্ হবে না (ফাতাওয়া শামী, ২য় খন্ড-৫৬৫)। এ প্রসঙ্গে হাদিসে উল্লেখ আছে, “হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) কে বসে নামায আদায় করা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন “কেউ যদি দাঁড়িয়ে নামায আদায় করে, তাহলে তা তার জন্য উত্তম, আর বসে নামায আদায় করলে সে দাঁড়িয়ে নামায আদায় করার অর্ধেক সাওয়াব পাবে (বুখারী: ১ম খন্ড ১৫০ পৃষ্ঠা ও জামে তিরমিযী ১ম খন্ড- ৮৫ পৃষ্ঠা)।
২। অপর বর্ণানায় পাওয়া যায়, দাঁড়াতে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও নফল নামায বসে পড়লে, জমিনে বসেই পড়তে হবে। চেয়ারে বসে পড়লে নামায সহী হবে না। জমিনে বসে হাটু বরাবর মাথা ঝুঁকিয়ে রুকু করতে হবে। সিজদা করতে সক্ষম হলে, জমিনেই সিজদা করতে হবে। (সূত্র: তাতার খানিয়া, ১ম খন্ড- ১৭১ পৃষ্ঠা)
৩। যিনি দাঁড়াতে সক্ষম, কিন্তু নিয়ম মত রুকু সিজদা করতে অক্ষম, রুকু সিজদা করতে মারাত্মক কষ্ট হয় বা রোগ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে অথবা রোগ সারতে বিলম্ব হবে, এ ধরনের লোক দাঁড়িয়ে ইশারায় রুকু, সিজদা করে নামায আদায় করবেন। জমিনে বা চেয়ারে বসে নামায আদায় করলে নামায সহীহ হবে না। কারণ, নামাযে কিয়াম বা দাঁড়ানো একটি ফরজ। অপারগতা ছাড়া তা বাদ দিলে নামায সহীহ হবেনা (সূত্র:বাদায়ি’উস সানায়ি, মাজমা’উল আনহুর, তাবইনুল হাকায়িক)।
৪। কেউ যদি কোনো কিছুর উপর ভর করে বা হেলান দিয়ে কিংবা ঠেক লাগিয়ে দাঁড়াতে পারেন, সরাসরি দাঁড়াতে পারেন না, তাহলে তিনি কিছুর উপর ভর করে বা ঠেক লাগিয়ে দাঁড়িয়ে নামায আদায় করবেন (সূত্র: ফাতহুল কাদীর, ২য় খন্ড, ৩৩ পৃষ্ঠা ও ফাতাওয়া শামী, ২য় খন্ড-৫৬৭ পৃষ্ঠা)।
৫। যিনি কিছুক্ষণ দাঁড়াতে পারেন, বেশী সময় দাঁড়াতে পারেন না এবং জমিনে বসতে সক্ষম, তিনি দাঁড়িয়ে নামায শুরু করবেন। যতক্ষণ সম্ভব দাঁড়িয়ে নামায করবেন। যখন কষ্ট হবে, জমিনে বসে বাকি নামায আদায় করবেন। এমতাবস্থায় চেয়ারে বসে নামায আদায় করলে নামায সহী হবে না (সূত্র: ফাতহুল কাদির ২য় খন্ড ৩৩ পৃষ্ঠা ও ফাতাওয়া শামী, ২য় খন্ড-৫৬৭ পৃষ্ঠা)।
৬। যারা দাঁড়াতে এবং রুকু সিজদা করতে অক্ষম, কিন্তু জমিনে যেকোন ভাবে বসতে সক্ষম, তারা তাদের পক্ষে যেভাবে সম্ভব সেভাবে জমিনে বসেই নামায আদায় করবেন। এ অবস্থায় চেয়ারে বসে আদায় করলে নামায সহীহ হবে না। জমিনে বসে তারা ইশারায় রুকু সিজদা করবেন। হাঁটু বরাবর মাথা ঝুঁকিয়ে ইশারায় রুকু এবং আরেকটু বেশী ঝুঁকিয়ে সিজদা করতে হবে (সূত্র: বাদায়ি’উস সানায়ি, ১ম খন্ড-২৮৪ পৃষ্ঠা)।
৭। হাঁটুতে সমস্যার কারণে অনেকে হাঁটু ভাঁজ করতে পারেন না। এ ধরনের লোকের পক্ষে যদি পশ্চিম দিকে না ছড়িয়ে জমিনে বসা সম্ভভ হয়, তাহলে তারা সেভাবেই জমিনে বসে নামায আদায় করবেন। এ অবস্থায় তার জন্য চেয়ারে নামায পড়া জায়িয হবে না।
নামাযের ভিতর কিয়াম করার ফযিলত ঃ
(ক) নবী করিম (সাঃ) বলেন, “মুছল্লী নামাযে যতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে তাঁর মাথার উপর বৃষ্টির ন্যায় নেকী ও আল্লাহ্ করুনা বর্ষিত হতে থাকে। (তিরমিযী ও জামে ছগীর)
(খ) মুসুল্লীগণ যখন নামাযের জন্য দাঁড়ায় তার জন্য আসমানের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়, এবং মুসুল্লী ও আল্লাহর মাঝে পর্দার যত আড়াল থাকে সমস্ত আড়াল বা পর্দা উঠিয়ে নেয়া হয়।
এখন মসজিদে ব্যাপকহারে যেভাবে চেয়ার ব্যবহার হচ্ছে, যার দ্বারা নামারূপ অসুবিধায় সৃষ্টি হয়, তাই এ ব্যাপারে সকল নামাযীদের একান্তভাবে সচেতন হওয়া দায়িত্ব ও কর্তব্য। সূত্র : সময়ের খবর