বিপথগামী হলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না : যুবলীগ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী

144

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দিনরাত পরিশ্রম করছি দেশের উন্নয়নের জন্য। এটা বাধাগ্রস্ত করতে চাইলে, বিপথগামী হলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। সন্ত্রাসী-জঙ্গি-মাদক ব্যবসায়ী যে-ই হোক, কাউকে ছাড় দেবো না। তিনি বলেন, দুর্নীতি করে জৌলুস বাড়তে পারে তবে মর্যাদা পাওয়া যায় না। গতকাল রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যুবলীগের সপ্তম কংগ্রেসে প্রধান অতিথি হিসেবে দেয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। দুপুর দেড়টার দিকে প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য রাখেন। এর আগে বেলা ১১টায় তিনি সম্মেলনের উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সম্মেলনের আহ্বায়ক চয়ন ইসলাম।

বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্ট পেশ করেন হারুনুর রশীদ, স্বাগত বক্তব্য রাখেন যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী ও শোক প্রস্তাব পাঠ করেন অ্যাডভোকেট বেলাল হোসেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনসহ সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। প্রধান অতিথি শেখ হাসিনাকে উত্তরীয় পরিয়ে দেয়া হয়। মূলপর্বের আগে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ‘জয়ের পরে জয়ের প্রতিচ্ছবি’ অনুষ্ঠিত হয়। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন আনজাম মাসুদ।

প্রধান অথিতির বক্তব্যে হাসিনা বলেন, কতটুকু পেলাম, কী পেলাম না, এটা নয়, কতটুকু কাজ করতে পারলাম, সেটাই হবে রাজনীতিবিদের চিন্তা। এই চিন্তা মাথায় রেখে যারা রাজনীতি করে, তারাই সফল হবে। বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের আদর্শে যারা থাকতে চায়, তাদের এই চিন্তা নিয়েই চলতে হবে। দুর্নীতি করে কেউ টাকা বানাতে পারে, এই টাকা দিয়ে জৌলুস করতে পারে, চাকচিক্য বাড়াতে পারে, আন্তর্জাতিক বড় বড় ব্র্যান্ডের জিনিস পড়তে পারে। কিন্তু তাতে সম্মান পাওয়া যায় না। মানুষ হয়তো অবাক হয়ে তাদের দিকে তাকাতে পারে। কিন্তু মর্যাদা পাওয়া যায় না। এটাই হচ্ছে বাস্তবতা। প্রধানমন্ত্রী যুবলীগের সব নেতাকর্মীসহ যুবসমাজকে মাদক, সন্ত্রাস ও দুর্নীতি থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানান। সবাইকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবাইকে আদর্শ নিয়ে চলতে হবে। এর মাধ্যমে সংগঠন যেমন চলতে পারে, দেশকেও কিছু দেয়া যায়। শেখ হাসিনা বলেন, একটা কথা মনে রাখতে হবে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ গড়ে উঠেছিল বাংলাদেশের মানুষের মুক্তি অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে। ক্ষমতা আগে দখল করে, উড়ে এসে জুড়ে বসাদের ক্ষমতার উচ্ছিষ্টের ভাগ দিয়ে এই সংগঠন গড়ে ওঠেনি। এই সংগঠন গড়ে উঠেছে নির্যাতিত, শোষিত, বঞ্চিত মানুষের জন্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামের লক্ষ্য নিয়ে। এই আদর্শ থেকে যারা বিচ্যুত হয়, তারা দেশকে কিছু দিতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের চলার পথে, উন্নয়নের পথে যদি কেউ বাধা দেয়, তাহলে তাকে আমি ছাড়বো না। সে যেই হোক, সে কোনও সহানুভূতি পাবে না। সন্ত্রাস, দুর্নীতি, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চলবে।

তিনি বলেন, যুবলীগ এই দেশে রাজনৈতিকভাবে অনেক অবদান রেখেছে। প্রত্যেকটা আন্দোলনে যুবলীগ ভূমিকা রেখেছে। মুক্তিযুদ্ধে এই যুবকরাই তো বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছে। তবে যুবকরা যেন দেশের কল্যাণে কাজ করে, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। এসময় তিনি চাঁদার হিসাব না করে যুবলীগকে জনকল্যাণে কাজ করার আহ্বান জানান। একইসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আত্মত্যাগ থেকে অনুপ্রাণিত হতে তিনি সবাইকে বঙ্গবন্ধু’র ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’ বই দুটি পড়ার আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর এই দুটি বই পড়তে বলবো। এছাড়া ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে গোয়েন্দা সংস্থার সব রিপোর্ট আমি প্রকাশ করছি। পৃথিবীতে এটা কখনও হয়নি। তবে এটার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর অবদান বের হয়ে আসবে। ইতোমধ্যে চারটি খন্ড বের হয়েছে। ১৪টা খন্ড বের হবে। এটার মধ্য দিয়ে বের হবে তিনি বাঙালি জাতির জন্য কী করেছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশ থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে এক কোটি মানুষ ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। পাকিস্তানিরা দেশকে ধ্বংস করে দিয়ে গিয়েছিল।

যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের দায়িত্ব নিলেন বঙ্গবন্ধু। শূন্যহাতে তিনি যাত্রা শুরু করেছিলেন। মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে তিনি দেশটিকে আবার গড়ে তোলেন। রাস্তাঘাট, সেতু, স্কুল-কলেজ চালু করেন। ঘরে ঘরে নির্মাণ সামগ্রী পৌঁছে দেয়া হয়েছিল। মাত্র ৯ মাসের মধ্যে একটি সংবিধান উপহার দিয়েছিলেন। এমনভাবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন যে দেশ স্বল্পোন্নত দেশের স্বীকৃতি পেয়েছিল। সাত ভাগ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। একটি প্রদেশ যা ছিল শোষিত-বঞ্চিত, সেটিকে তিনি স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলেন। তিনি বলেন,৭৫-এ সেই অগ্রযাত্রা বন্ধ করে দেয়া হয়। দেশ অন্ধকারের দিকে যাত্রা শুরু করে। ১৯টি ক্যু হয়েছিল। যুবসমাজকে বিপথে ঠেলে দেয়া হয়। ছাত্রদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে ব্যবহার করা হয় ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার কাজে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করে দেয়া হয়। যারা পাকিস্তানে পালিয়ে গিয়েছিল, তাদের ফিরিয়ে আনা হয়। এদের ভোটের অধিকার দেয়া হয়, মন্ত্রী করা হয়। রাষ্ট্রপতি প্রার্থী পর্যন্ত হতে দেয়া হয়েছিল। ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। বাংলাদেশের মানুষ প্রথম বুঝলো কোন সরকার দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে পারে। কিন্তু সেই সুখ বেশিদিন টিকলো না।

তিনি বলেন, ২০০১ সালে আমাদের সরকারে আসতে দেয়া হলো না। সেখানেও ছিল চক্রান্ত। এসময় বিগত সংসদ নির্বাচনের সমালোচনার জবাবে ২০০৮ সালের ভোটে বিএনপির ফলাফল স্মরণ করিয়ে দেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, সেই সময় বিএনপি-জামায়াত জোট মাত্র ২৯টা সিট পেয়েছিল। তারা নির্বাচন নিয়ে অনেক কথা বলে। তাহলে ২০০৮ এর নির্বাচন নিয়ে তো কেউ প্রশ্ন করেননি। বিএনপি যদি এতই জনপ্রিয় সংগঠন হয়ে থাকবে, তাহলে মাত্র ২৯টা সিট পেয়েছিল কেন? ওই নির্বাচন নিয়ে তো কোনো কথা নেই। দুর্নীতির মামলায় দন্ডিত খালেদা জিয়ার সঙ্গে আফ্রিকার কালো মানুষের নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার বন্দিত্বের যে তুলনা বিএনপি নেতারা করেন,তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, বিএনপি নেত্রী, যিনি এতিমের অর্থ আত্মসাৎ করে দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে, তার তুলনা করে নেলসন ম্যান্ডেলার সাথে। আমি মনে করি, এতে নেলসন ম্যান্ডেলাকে অপমান করা হচ্ছে। কারণ নেলসন ম্যান্ডেলা তার জাতির স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করে কারাগারে ছিলেন। দুর্নীতি করে কারাগারে যাননি। এই ধরনের একজন নিকৃষ্ট, যিনি ক্ষমতায় থাকতে গ্রেনেড হামলা করে আমাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগের আইভি রহমানসহ ২২ জন নেতাকর্মীকে হত্যা করেছে।

একবার না বারবার চেষ্টা করেছে হত্যাকাণ্ড চালাতে যারা অস্ত্র দিয়ে, অর্থ দিয়ে এদেশের সমাজকে ধ্বংস করেছে। খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানের প্রসঙ্গ ধরে শেখ হাসিনা বলেন, যার ছেলে ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় সাজাপ্রাপ্ত, ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার ষড়যন্ত্রে জড়িত বলে সাজাপ্রাপ্ত, মানি লন্ডারিং মামলায় সাজাপ্রাপ্ত। তাদের সাথে এই ধরনের আন্তর্জাতিক স্বনামধন্য সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের তুলনা এরা কোন মুখে করে, সেটা আমার প্রশ্ন। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শাসনামলে সমালোচনা করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, তারা দেশের জন্য কিছুই করতে পারেনি। খুন করা, মানুষের উপর নির্যাতন করা,অত্যাচার করা এটাই তারা করতে পেরেছে। বিএনপির আমলটাই ছিল জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস, বাংলা ভাই সৃষ্টি, দুর্নীতি, মানি লন্ডারিং এবং এই ধরনের নানা ঘটনা। সমস্ত বাংলাদেশ সারা বিশ্বে তাদের সম্মান হারাল। পাঁচ-পাঁচবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হল বাংলাদেশ। শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধু লোভ লালসার ঊর্ধ্বে উঠে একটি দেশ সৃষ্টি করে দিয়ে গিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, যুবকরাই মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে। এ দেশ গড়ে তোলার দায়িত্বও যুবকদের। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যেন কোনো যুবনেতার বদনাম না হয়। যুবকদের অবশ্যই দেশের জন্য কাজ করতে হবে এবং দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। তিনি বলেন, পদ্মা সেতু বিষয়ে আমার ও আমার পরিবারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে। আমি চ্যালেঞ্জ করেছিলাম। পরে প্রমাণ হয়েছে তারা আমার এবং আমার পরিবারের বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতি বের করতে পারেনি বরং খালেদা জিয়া এবং তার পরিবারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি খুঁজে পেয়েছিল। শেখ হাসিনা বলেন, সততার শক্তি সবচেয়ে বড় শক্তি। সততা আছে বলেই চ্যালেঞ্জ করেছিলাম। দেশের সম্পদ পদ্মা সেতু যাতে গড়ে না ওঠে সেজন্য আমার দেশের কিছু লোক আমেরিকায় আমার বিরুদ্ধে নালিশ করেছিল। এই প্রসঙ্গে গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, দেখা গেল একটা ব্যাংকের এমডির পদ ছাড়তে পারে না, এদিকে নোবেল প্রাইজ পায়, অথচ একটা ব্যাংকের এমডি পদ ছাড়ে না। সেই পদ কেন বয়সের কারণে ছাড়তে হল, সেই প্রতিশোধ নেয়ার জন্য পদ্মা সেতু বন্ধ করার জন্য আমেরিকায় গিয়ে ধরনা দিল। তারা আমাদের উপর দোষ দিলো দুর্নীতির। আমি চ্যালেঞ্জ দিলাম এবং সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ৯০ ভাগ আমরা নিজের অর্থে বাস্তবায়ন করছি। দশ পার্সেন্ট টাকা আমরা বিদেশিদের কাছ থেকে নিয়েছি কিন্তু সেটা আবার তাদের সুদে-আসলে বুঝিয়ে দিচ্ছি। কারও কাছে দান নিয়ে আমরা টাকা নিচ্ছি না। ধার করে ঘি খাওয়ার চেয়ে নিজের অর্থায়নে নুনভাত খাওয়া অনেক ভালো। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে এগিয়ে যাবে। কেউ আর বাংলাদেশের এগিয়ে চলা রুখতে পারবে না। আগামী ৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ এশিয়ার উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যাতে উন্নত-সমৃদ্ধ একটি বাংলাদেশ পায় এজন্য আমরা ডেল্টাপ্লান ২১০০ ঘোষণা করে কাজ করে যাচ্ছি।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, ইউসুফ হোসেন হুমায়ূন, মোজাফফর হোসেন পল্টু, সভাপতিমন্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মতিয়া চৌধুরী, আব্দুর রাজ্জাক, আব্দুল মতিন খসরু ও সাহারা খাতুন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আব্দুর রহমান, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ,সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, বিএম মোজাম্মেল হক, মিজবাহ উদ্দিন সিরাজ ও এনামুল হক শামীম, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাসসহ কেন্দ্রীয় নেতারা।

এদিকে কংগ্রেস ঘিরে সারা দেশ থেকে আসা কাউন্সিলরদের পদচারণায় মুখর ছিল সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। নানা রঙ্গের ব্যানার ফেস্টুন নিয়ে তারা সম্মেলন কেন্দ্রে হাজির হন। সৌজন্যে : মানবজমিন।।