একূল-ওকূল দু’কূলই হারালেন অং সান সুচি

38

একূল-ওকূল দু’কূলই হারালেন অং সান সুচি। সেনাবাহিনীর রাজনীতির মারপ্যাঁচে তিনি আন্তর্জাতিক দুনিয়ার কাছে এখন ঘৃণিত। আর নিজের দেশে ক্ষমতাহীন। যে বন্দিদশা থেকে তাকে মুক্ত করে গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখিয়েছিল সেনাবাহিনী, তারা তাদের স্বার্থ উদ্ধার করে আবার সুচিকে নিক্ষেপ করেছে সেই বন্দিত্বে। মাঝখান দিয়ে সুচি তার হৃত গৌরব, বিশ্বজোড়া খ্যাতি সব হারিয়েছেন। মাত্র একটি ইস্যুতে তিনি বিশ্বের কাছ থেকে পেয়েছেন ধিক্কার। রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর সেনাবাহিনী যে নৃশংসতা চালিয়েছে, সে বিষয়ে শুরুতে তিনি ছিলেন মুখে কুলুপ আঁটা। পক্ষ নিয়েছেন সেনাদের।

নিজ দেশে মানবাধিকারের ভয়াবহ ঘৃণ্য লঙ্ঘনের সময় তিনি চুপ থাকায়, পরে সেনাবাহিনীর পক্ষ নেয়ার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংগঠন তাকে যেসব সম্মানসূচক উপাধি বা পদক দিয়েছিল, একে একে তা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের প্রতীক, মানবতার প্রতীক হিসেবে সারা বিশ্বে পরিচিতি পাওয়া অং সান সুচির মান সম্মান উবে গেছে। তাকে যারা বন্দি অবস্থা থেকে গণতন্ত্রের আলোতে নিয়ে এসেছিলেন, তাদের স্বার্থ উদ্ধার হয়ে গেছে। মাঝখান দিয়ে সুচি যে সম্মান অর্জন করেছিলেন, তা মুছে দেয়ার কৌশল নিয়েছিলেন তারা। ফলে সুচি আবার বন্দি। ক্ষমতার মসনদে আবার সেই অমিত ক্ষমতাধর সেনাবাহিনী। অন্য সময়ে সুচিকে আটক বা তার কোনো উদ্বেগজনক খবরে বিশ্ব মিডিয়া, বিশ্ব নেতারা, মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠনগুলো গর্জে উঠেছে। কিন্তু সোমবার ভোরে তাকে গ্রেপ্তার করলেও বিশ্ব নেতারা এর নিন্দা জানিয়েছেন। যেভাবেই বলা হোক- সুচি এখন এক পতিত তারকা। তিনি আবার গণতন্ত্রের আকাশে উঠতে পারবেন- এমনটা আশা করা খুব কঠিন বিষয়।
কয়েক দশক পরে ২০১৫ সালে মিয়ানমার গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় ফিরলেও ক্ষমতার নেপথ্যে থেকে যায় দেশটির অমিত শক্তিধর সেনাবাহিনী। বেসামরিক নেত্রী, কমপক্ষে ১৫ বছর গৃহবন্দি থাকা ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) নেত্রী অং সান সুচি ক্ষমতায় ফিরলেও তার মেরুদণ্ড সোজা রাখতে পারেননি। এমনটা অনেকবার প্রমাণিত হয়েছে। তিনি যে বিশ্বজোড়া শান্তির প্রতীক, গণতন্ত্রের আইকনে পরিণত হয়েছিলেন, তা তলে তলে ধ্বংস করে দিয়েছে সেনাবাহিনী। শেষ পর্যন্ত তার আন্তর্জাতিক মর্যাদা ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে সেনাবাহিনীই তাকে আবার ফেরত পাঠিয়েছে সেই বন্দিদশায়। মিয়ানমারের ‘ঝানু রাজনৈতিক’ সেনাবাহিনীর রাজনীতি হয়তো বুঝে উঠতে পারেননি সুচি। তাই তাদের পক্ষ নিয়ে তিনি রোহিঙ্গা নির্যাতনের সময় ছিলেন চুপ করে। এমনকি সেনাবাহিনীর জয়গান গেয়েছেন। সারাবিশ্বকে যখন কাঁদিয়েছে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ‘জাতিনিধন’ অভিযান, তখন তার কণ্ঠ রুদ্ধ। এতে বিস্মিত হয়েছে বিশ্ব। আবার যখন তাকে গ্রেপ্তার করেছে তারই সেই সেনাবাহিনী তখন সেই বিশ্বই বিস্ময়ের চোখে তাকাচ্ছে তার দিকে। দেখছে একজন কিংবদন্তি রাজনীতিক কীভাবে মর্মান্তিক পরিণতির দিকে এগিয়ে যান। তিনি কি এখন আর আগের সেই অনুকম্পা পাবেন! সঙ্গত কারণেই এসব প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে। মিয়ানমারে সর্বশেষ যে সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে সেখানেই সেনাবাহিনী তাদের রাজনীতির ঘুঁটি চেলেছে। সরকারে তাদের অবস্থানকে শক্তভাবে ধরে রাখতে পার্লামেন্টে শতকরা ২৫ ভাগ কোটা সংরক্ষিত রেখেছে। এর ফলে যে সরকারই মিয়ানমারে বেসামরিক লেবাসে আসুক না কেন, তাদেরকে আসলে সেনাবাহিনীর হাতের পুতুল হয়ে থাকতে হবে।
গত নভেম্বরে মিয়ানমারে সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচন হয়েছে। সেই নির্বাচনে জাতীয় পার্লামেন্টের শতকরা ৮৩ ভাগ আসনে বিজয়ী হয়েছে সুচি নেতৃত্বাধীন এনএলডি। কিন্তু এই ফল মানতে নারাজ সেনাবাহিনী। তারা দাবি করছে, নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি হয়েছে। এ জন্য সেনাবাহিনী ‘টেক অ্যাকশন’ বা ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দেয় গত সপ্তাহে। তখন থেকেই সামরিক অভ্যুত্থানের গা শিউরে ওঠার মতো আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অং সান সুচি মিয়ানমারের সাবেক এক রাজবন্দি। কয়েক দশকের স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দীর্ঘ এক আইকন তিনি। বয়স এখন ৭৫ বছর। বহু বছর গৃহবন্দি থাকার পর তিনি ২০১৫ সালে ক্ষমতায় ফেরেন। বিশ্বজোড়া খ্যাতি পান। তার কাছ থেকে নতুন কিছু প্রত্যাশা করে বিশ্ববাসী। কিন্তু ২০১৭ সালে রাখাইনে মুসলিম রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ নৃশংসতার কারণে তার সেই আন্তর্জাতিক খ্যাতি ধুলোয় মিশে যায়। চারদিক থেকে ধিক্কার জানানো হয় তাকে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সেই নৃশংসতার হাত থেকে জীবন বাঁচাতে কমপক্ষে সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেন। অথচ তাদের জন্য মন টলেনি ‘মানবতার নেত্রী’ অং সান সুচির। তিনি সেনাবাহিনীর পক্ষেই সাফাই গেয়ে যান। এমনকি হেগে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে (আইসিজে) দাঁড়িয়েও তিনি নিজের অর্জিত সম্মানকে বিসর্জন দেন। তবে কি পর্দার আড়ালে তার  পেছনে বন্দুক তাক করা ছিল? তিনি যদি সত্য কথা বলতেন, যদি নিজের দেশে অবস্থান করে রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতেন, তাহলে সেনাবাহিনী ক্ষুব্ধ হতো নিশ্চয়। দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধদের সমর্থনে হয়তো ভাটা পড়তো। কিন্তু সারা বিশ্বে তিনি গণতন্ত্রের এক জ্বলজ্বলে তারকা হয়ে থাকতেন।
কিন্তু দৃশ্যত ক্ষমতার মোহ পেয়ে বসেছিল তাকে। তিনি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সন্ধি করেছেন। তারা তাকে গণতন্ত্র দেয়ার টোপ ফেলেছিল। সেই টোপে পা দিয়েছেন সুচি। এখন বলা যায়, সেই গণতন্ত্রের টোপ দিয়ে সুচিকে ক্ষমতায় এনে রাখাইন থেকে ‘জাতিনিধন যজ্ঞ’ চালিয়েছে সেনারা। এর মধ্য দিয়ে রাখাইনকে প্রায় রোহিঙ্গামুক্ত করেছে। রাষ্ট্রের দায়িত্বে থাকায় এর জন্য জবাবদিহি করতে হয়েছে সুচিকে। পক্ষান্তরে সুচির সব পদক কেড়ে নিয়েছে বিশ্ব। এর মধ্য দিয়ে তারা সুচিকে বিশ্বের কাছ থেকে ‘নিঃসঙ্গ’ করে দিতে পেরেছে। সেনাদের এই টোপ হয়তো তিনি বুঝতে পারেননি। তাই নিজের সারাজীবনের অর্জন বিসর্জন দিয়ে সেনাবাহিনীর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন গণতন্ত্রের প্রতীক, শান্তির প্রতীক হয়ে ওঠা অং সান সুচি। জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালতে দাঁড়িয়ে তিনি কীভাবে এই সেনাবাহিনীকে বাঁচাতে মিথ্যাচার করেছেন! ভাবতেও বিস্মিত হতে হয়। নিজের অর্জন, মর্যাদা জলাঞ্জলি দিয়ে অবলীলায় বলে গেছেন, রাখাইনে কোনো গণহত্যা হয়নি। তবে সেখানে সহিংসতার কথা স্বীকার করেছেন তিনি। ক্ষমতার দ্বন্দ্বে সেই সেনাবাহিনী তাকে ‘প্রতিদান’ দিয়েছে! সোমবার ভোরে সুচি ও দেশটির প্রেসিডেন্টকে সেই সেনাবাহিনী আটক করেছে। পরে সেনাবাহিনীই বিবৃতি দিয়েছে। তারা জোর গলায় সামরিক অভ্যুত্থানের ঘোষণা দিয়েছে। এই সেনাবাহিনীর জন্য সারা বিশ্বের সামনে দাঁড়িয়ে নির্লজ্জের মতো মিথ্যা বলেছেন সুচি।
রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে জাতিসংঘের বিচার আদালতে মামলা করে আফ্রিকার ছোট্ট দেশ গাম্বিয়া। সেখানে শুনানির দ্বিতীয় দিনে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে বক্তব্য রাখেন সুচি। এদিন তিনি রাখাইনে সহিংসতার কথা স্বীকার করলেও একে কোনোভাবেই গণহত্যা বলা যায় না বলে মন্তব্য করেন।  জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালতে মিয়ানমারের পক্ষে শুনানির সূচনা বক্তব্যে সুচি বলেন, দুঃখজনকভাবে গাম্বিয়া রাখাইন রাজ্যের একটি অসম্পূর্ণ, ভ্রান্তিকর চিত্র উপস্থাপন করেছে। তবে রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি ‘জটিল’ বলে উল্লেখ করেন তিনি। রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের ‘দুর্দশার’ কথাও এসময় স্বীকার করেন সুচি। কিন্তু এর পরিপ্রেক্ষিতে হত্যা ও অন্য সহিংসতার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সেনা কর্মকর্তাদের বিচার ও শাস্তি দেয়ার কথা উল্লেখ করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশের সঙ্গে হওয়া চুক্তির কথাও তুলে ধরেন তিনি।
জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতি নিধনের উদ্দেশ্যে গণহত্যা চালানো হয়েছে বলে রিপোর্ট দিয়েছে। মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সহ মানবাধিকার বিষয়ক বিশ্বের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো প্রামাণ্য হিসেবে তুলে ধরতে থাকে কীভাবে রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। গ্রামের পর গ্রাম নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়েছে। কীভাবে রোহিঙ্গাদের গ্রামগুলোর চিহ্ন মুছে দেয়া হচ্ছে। কীভাবে স্বামী, সন্তান, আত্মীয়দের সামনে রোহিঙ্গা যুবতীদের ধর্ষণ করেছে মানুষরূপী সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য। গ্রামের পর গ্রাম যখন আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে, নারীর সম্ভ্রম নিয়ে যখন ছিনিমিনি খেলা করতে থাকে সেনাবাহিনী, তখন মানবতার নেত্রী হিসেবে পরিচিত, শান্তিতে নোবেলজয়ী অং সান সুচি ছিলেন একেবারে নীরব। যেন, তিনি উপভোগ করছিলেন দৃশ্য। তার এমন ভূমিকায় নিন্দার ঝড় ওঠে সারাবিশ্ব থেকে। ছি ছি প্রকাশ করা হয়। একে একে কেড়ে নেয়া হয় তার সব পদক। এমনকি তাকে দেয়া শান্তিতে নোবেল পুরস্কার ফিরিয়ে নেয়ার দাবি ওঠে। সারাজীবন গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করে, মানুষের অধিকারের জন্য লড়াই করে, কমপক্ষে ১৫ বছর গৃহবন্দি থেকে, শেষ পর্যন্ত তিনি সেনাবাহিনীর কাছে কি তবে মাথা নত করে দিয়েছিলেন! তাকে নিয়ে গর্ব করতো যে বিশ্ব, তারা তার মুখের ওপর ঘৃণাবৃষ্টি বর্ষণ করতে থাকে! তাহলে কি অর্জন করলেন সুচি! একদিকে হারালেন আন্তর্জাতিক খ্যাতি, অন্যদিকে হারালেন ক্ষমতা। ফলে একূল-ওকূল দু’কূলই এখন সুচির কাছ থেকে অনেক অনেক দূরে।
বিশ্ব মিডিয়ায় এক পর্যায়ে খবর প্রচারিত হয়, মন্তব্য কলামের পর কলাম ছাপা হয়। তাতে বলা হয়, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছেন সুচি। শেষটা বলে দিচ্ছে তেমনই। সেনাবাহিনী তাকে নিয়ে যা খুশি তাই করতে পারে। তিনি একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর, অথচ রোহিঙ্গা নির্যাতনের সময় তিনি সেনাবাহিনীর ভয়ে কথা বলার সাহস পান না! আবার যখন নভেম্বরের নির্বাচনে সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক স্বার্থে আঘাত লেগেছে, তখন তারা তাকে, প্রেসিডেন্টকে আটক করেছে। তবে কি সুচি সেনাদের হাতের পুতুল নন!!! এর মধ্য দিয়ে তিনি নিজের সত্তাকে বিকিয়ে দিয়েছেন।